সোমবার - কলকাতা



থার্ড ম্যান

Written by Sourav Mitra, Posted on 2014-08-20,12:37:27 a

Denise Compton in Ranji Trophy,anecdote

ইংল্যান্ডে নাকানি চোবানি খেয়ে আপাতত আমাদের দেশের মহান সব ক্রিকেটাররা কিছুদিন মৌন থাকবেন। বোর্ডও লোকদেখানো কিছু পদক্ষেপ নেবে, সামনে অস্ট্রেলিয়া সফর, যা চলছে তাতে সব ঠিক থাকলে সেখানেও ল্যাজেগোবরে হওয়ারই কথা, আবার কিছু মাস চলবে ক্রিকেটারদের মুণ্ডপাত তারপরেই কালের নিয়মে শুরু হয়ে যাবে IPL.ব্যাস, গ্ল্যামার-টাকা-মারাকাটারি ক্রিকেট, কুয়োর ব্যাং 'ক্রিকেট প্রেমী'(!)দের উন্মত্ততা, লোকে সব ভুলে এই সব অপোগণ্ড খেলোয়াড়দের যাদের দেশের প্রতি বা তার ক্রিকেট ঐতিহ্য-ইতিহাস সম্পর্কে কোনও দায়ই নেই, তাদের নিয়েই মাতামাতি করবে। পোড়া গরীব দেশের ফিল্মস্টার, উদ্যোগপতিদের ছড়ানো টাকার বাজারে বিদেশের ক্রিকেটাররাও দলে দলে আসবেন, পারফর্ম করবেন।

সত্তর বছর আগে ফিরে যাই। ফ্লাড লাইট, চিয়ার লিডার, বিশাল স্টেডিয়াম/স্ট্যান্ড তাতে গ্ল্যামার জগতের চোখ ধাঁধানো ব্যক্তিত্ব এসব কিছুই নেই, হয়ত বা সবই আছে, হয়ত অন্য নির্মোকে। আঙ্গিকটা অবিশ্যি একই থেকে যায়। মজার ব্যাপার, ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে সম্মানীয় খেতাব 'রন্‌জি ট্রফি' যাঁর নামাঙ্কিত, সেই রঞ্জিৎ সিংজি, তিনি ভারতের হয়ে একটিও টেস্ট ম্যাচ খেলেননি। 'রন্‌জি' তে খেলে যাওয়া বিদেশী কিংবদন্তিদের তালিকা দীর্ঘ নয়, তবে যে কটি নাম সম্ভ্রম জাগাতে বাধ্য তার মধ্যে ব্র্যাডম্যান সমসাময়িক যুগের এক মহান ব্যাট্‌সম্যান ডেনিস কম্পটন একটি। ১৯৪৩ নাগাদ দশকের মাঝামাঝি সময়, দেশ স্বাধীন হবার মুখে। ভারত সরকারী ভাবে কোনও দেশ নয়, কিছু রাজ্য বা Province এর সমষ্টি। সে যুগে 'রন্‌জি' খেলা হত সেই সব Province গুলির মধ্যে, আর সেগুলির শাসনক্ষমতার ভার থাকত সেখানকার রাজাদের উপর। সেই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বেশ কিছু বৃটিশ সার্জেন্ট ইন্ডিয়ান রেজিমেন্ট এর অংশ ছিলেন, অনেকেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বৃটিশ সেনার ভারতীয় সেপাইদের। ডেনিস কম্পটন ছিলেন সেরকমই এক Allied Serviceman যিনি দীর্ঘ সময় এদেশে কাটিয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

এমনই এক 'রন্‌জি' মরসুমের ফাইনাল। হোলকার বনাম বম্বে(এখনকার মুম্বাই), স্থান ব্রাবোর্ন স্টেডিয়াম। বিজয় মার্চেন্টের বম্বে প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ ৪৬২, ১০২ রানের লীড। দ্বিতীয় ইনিংসে বম্বে করল ৭৬৪। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, সেইসময় 'রন্‌জি' খেলা হত ম্যাচের শেষ পর্যন্ত, সে যত দিনই খেলা হোক না কেন, অর্থাৎ, কোনও ম্যাচ ড্র হবেনা, ফলাফল হবেই। হোলকারের দ্বিতীয় ইনিংসে তারা শুরুতেই বিপাকে, ১২/২। ক্রিজে ডেনিস কম্পটন আর মুস্তাক আলি। একদিকে মুস্তাকের আগ্রাসী ব্যাটিং আর অন্যদিকে ক্রিজে তাঁবু গেড়ে বসে আছেন কম্পটন। যাই হোক, ৮৬৯ এর বিশাল টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে হোলকার দল প্রায় ৪০০ রানে হারে। মুস্তাক আলি ১০৯ করেন আর ডেনিস কম্পটন ২৪৯ রানে অপরাজিত থাকেন। 

তবে, এই ম্যাচটি আরও অসংখ্য First Class ম্যাচের থেকে আলাদা হয়ে আছে মাঠের বাইরের এক ঘটনার জন্য। ম্যাচের ৭ম কী ৮ম দিনে (আগেই বলা হয়েছে খেলা হবে ম্যাচের ফলাফল না হওয়া পর্যন্ত) সেঠ হীরালাল নামক এক স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী ডেনিস কম্পটনকে বলেন 'দেখুন কম্পটন সাহেব এই ম্যাচ আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের জিততেই হবে। আপনি আপনার ১০০ রান পূর্ণ করার পর যত রানই করবেন প্রত্যেক রানের জন্য আপনি পাবেন ১০০ টাকা(তৎকালীন ভারতীয় মুদ্রায়)'।

পরিমাণে সেই টাকাটা কত ছিল তা আমরা ডেনিস কম্পটনেরই একটা মন্তব্যে আন্দাজ করতে পারি। নিজের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন প্রত্যেক বার কভারের চিড়ে একটা চার মানে আমার হাতে ৩০ পাউন্ড। আজকের হিসেবেও ৩০ পাউন্ড মানে প্রায় ২৫০০ টাকা। আমরা বুঝে নিতেই পারি সে পরিমাণ অর্থ সেই সময়ে সৌভাগ্য না এনে দিতে পারলেও অবহেলা করার মত ছিল না একেবারেই। স্পন্সরশীপ, এন্ডোর্সমেন্ট এই কথা গুলো খেলা ধূলার ক্ষেত্রে অন্য গ্রহের concept তখন। 

যাই হোক, কম্পটনের নিজস্ব স্মৃতিচারণায়, 'হোলকারের ইনিংস শেষ হলে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাওয়ার সময় আমি উপস্থিত ক্রিকেটপ্রেমীদের হাততালি, অভিনন্দন এসবে ভ্রুক্ষেপ করার মানসিকতায় ছিলাম না, মনে মনে পাটিগণিতের হিসেব কষছিলাম আমার প্রাপ্য নিয়ে, প্রায় ১৩০০ পাউন্ড', তাঁর ভাষায় এই অঙ্কটা ছিল 'Absolute fortune' ।

ম্যাচ শেষে সি.কে.নাইডু কম্পটনকে নিয়ে যান সেই জনৈক ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত তাঁবুতে। কেউ একজন কম্পটনকে একটি চিঠি দেন, তাতে লেখা 'Personal and Very Urgent' । কম্পটনের নিজের বক্তব্যে আমরা জানতে পারি চিঠিটি নেবার মুহূর্তে তিনি নিজের মনে মনে ভাবছিলেন দেশে ফিরে কোথায় কী ধরণের বাংলো কিনবেন। চিঠিটি খুলে তাতে একটি লেখা পেলেন, 'জরুরী কাজে কলকাতা রওনা হতে হল, মাপ করবেন'।

মুস্তাক আলির কথায় অবশ্য আমরা একটি অন্যরকম ব্যাখ্যা পাই যখন উনি বলেন যে 'প্রস্তাবটি শুধুমাত্র প্রথম ইনিংসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, দ্বিতীয় ইনিংসের জন্য নয়। ওই অদম্য প্রলোভন সত্ত্বেও আমি আমার স্বাভাবিক আগ্রাসী ব্যাটিং করেছি, আমার করা ১০৯ রানের বিনিময়ে পাই ৪৫০ টাকা। সাবধানী ব্যাটিং করলে হয়ত আমার ভাগ্যই বদলে যেত।'

কী বন্ধুরা, কী মনে হয়? কম্পটন, মুস্তাক আলি, বিজয় মার্চেন্ট, সি.কে.নাইডু দের মত ক্রিকেটের প্রবাদপুরুষদের আজকের আধুনিক ক্রিকেটারদের জায়গায় আর ওই ব্যবসায়ীকে IPL এর ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের জায়গায় কল্পনা করে নিলে প্রেক্ষিতের খুব বেশী পার্থক্য কী পাই আমরা? অবিশ্যি আজকের পেশাদারিত্বের যুগে এমন ঘটনা হাতে গোনা নয়, কারণ এমনটা হয়না!

পুনশ্চঃ কম্পটন ভারতে ১৯৪৪-৪৫ এবং ১৯৪৫-৪৬ মরসুমে মোট ১০ টি ম্যাচ খেলেন, রান করেন ১০৩৬, গড় ৮৭.০৭, ৭টি শতরান।



আমাদের উপপদ এর সরঞ্জাম গুলি

আপনার মন্তব্য



শেষ পাওয়া এই বিভাগের খবর

জনপ্রিয় খবর গুলি