বুধবার - কলকাতা



আমাদের প্রিয়া কাফে, আমাদের গৌতম

Written by Sourav Mitra, Posted on 2014-06-02,01:13:05 a

Gautam Chatterjee,happy birthday
১৯৭৫, ভারতের অর্থনীতি বিশ্বের বাজারের বল্গাহীন নিয়ন্ত্রণে চলে আসেনি। উদারীকরণের নবজাগরণ(!) হতে বাকী আরও ১৬ বছর। বাংলার তবু তর সইছে না। বছর পাঁচেক হল, পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। কোন কোন বাড়িতে ফিস ফাস আলোচনা, কারো পাশের বাড়ির ছেলেটাকে বহুদিন দেখা যাচ্ছে না। কেউ বলল এই সেদিনই দেখা গেছে তাকে, আবার উধাও। পুলিশ নাকি খোঁজ করছে ওর। 'আন্ডারগ্রাউন্ড', 'চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান', 'নক্সালবাড়ি', 'থার্ড ডিগ্রি' শব্দ গুলো হাওয়ায় জলীয় বাষ্পের মত ভেসে বেড়াত। 'মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ সর্বহারার' মতবাদ স্লোগানে ছেয়ে গেছে কোলকাতার অলিগলি। বিপ্লব সর্বত্র, বিপ্লব সেলুলয়েডেও, মৃণাল সেনের যুগান্তকারী ট্রিলজি, 'কোলকাতা ৭১', 'ইন্টার্ভিউ', 'পদাতিক'। ছেলেগুলো বড় বেয়াড়া, কথা শোনেন। প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর পরিণত হয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্রে আস্থা হারানো ভেঙ্গেচুরে খোলনলচে বদলানোয় বিশ্বাসী বিপ্লবীদের আঁতুড়ঘরে। তারই মধ্যে Emergency। খবরের কাগজ দিনের আলো দেখার আগে তা পড়ে দেখতেন নেতা-মন্ত্রীরা। সেই সময়েরই কথা। প্রেসিডেন্সির এক দামাল ছেলে, মুখে একগাল কালো দাড়ি। তাকেও শুষে নিল অতিবাম রাজনীতি, মতাদর্শ। ঠোঁটের কোণে সিগারেট, কোলে গীটার, মুখে আগুনে সুর, দিন বদলের কথা। এমনি এক সময়ে মেডিকাল রিপ্রেসেন্টেটিভের চাকরী নিয়ে ভোপাল যাওয়া, সাথে গানও চলতে লাগল পুরোদমে, তবে নকশাল আন্দোলনের মতই অন্তঃসলিলা হয়ে। তারপর কোলকাতা ফিরে আসা, শপিং মল, মোবাইল, বিশ্বায়নের ঝাপটা তখন কোথায়??!!! ছো! ছিল বলতে এই সাহেব পাড়া, হ্যাঁ, এই মল্লিকবাজার থেকে পার্ক স্ট্রীট মেট্রো। গ্লাসের টুংটাং, অট্টহাসিতে অশ্লীলতার ঝংকার, নগ্নতা, মদ আর তার মাঝেই গান। ভাই প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বিশু চট্টোপাধ্যায় আর রঞ্জন ঘোষাল মিলে তৈরি হল 'সপ্তর্ষি'। বাংলা গানেও ঘটল নিঃশব্দ বিপ্লব। ক্রমে তার থেকেই ভূমিষ্ঠ হল 'মোহিনের ঘোড়াগুলি'। বাংলা ব্যান্ড! কী সাঙ্ঘাতিক! সাতসাগর পারের Beatles নয়, খোদ কোলকাতার রাজপথে, বাংলা ভাষায় দাপিয়ে বেড়ানো ব্যান্ড, গানের দল সোজা ভাষায়, তার আগে ব্যান্ড বলতে বাঙ্গালী বুঝত হয় ব্যান্ড পার্টি নয়ত তাসা পার্টি। বাংলা 'ব্যান্ডের' pioneer, হয়ত বাংলা গানেরও, হয়ত কিছুটা উপেক্ষিত, কিছুটা বিস্মৃত নায়ক, সোনার ছেলে গৌতম চট্টোপাধ্যায়। নিঃশব্দেই গতকাল চলে গেল তাঁর আরও একটি জন্মদিন। মৃত্যুর পরে ১৮ তম। এর আগে লিড গিটারিস্ট হয়ে The Urge এর সাথে কখনও Trincas, কখনও Mouline Rouge দাপিয়ে বেড়ানো চলছিলই, তবে এবার শুরু হল প্রসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পালা। সৃষ্টি সুখের উল্লাস। পার্লামেন্ট ডেমোক্রেসি বহাল তবিয়তে বেঁচে গেলেও বাংলা গানে শুরু হল ভাংচুর। সম্ভবত, হাংরী জেনারেশন ব্যতিরেকে বাংলা সংস্কৃতিতে গভীরতম অভিঘাত। আজ কলেজের socail হয়না, fest হয়। ব্যাঙের ছাতা, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মত সব গলিতে বাংলা ব্যান্ড। সত্যিকারের ভালো সুর ও প্রচেষ্টা যেমন আছে তেমনই আছে গলাবাজি করে বেসুর সদর্পে জাহির করা, ভাষাটাকে জোর করে পালটে দেওয়ার অপচেষ্টা, বিকৃত উচ্চারণ, লম্বা চুল, শরীরে অজস্র ছিদ্র, অকারণ ম্যানারিজ্‌ম্‌। তাঁর ওসব প্রয়োজন হয়নি। 'কিছু সংলাপ কিছু প্রলাপ'-এ কফি হাউসের মলিন চেয়ারে বসে কাঁচা পাকা দাড়ি মুখে 'প্রিয়া কাফে' গানটি ত আমাদের 'তোমাকে চাই'-এর মতই রোমাঞ্চিত করে। বাংলার মেঠো সুরের ধুলোমাখা গায়ে অভিজাত জ্যাজ্‌কে তার গুমোর ভেঙ্গে আলিঙ্গন করাল কে? তিনিই ত'। সৃষ্টি হল 'বাউল-জ্যাজ্‌'। তবে সময় বদলেছে। বাঙালী সুরকার, তাঁর সুর ঝেড়ে অম্লান বদনে জাতীয় স্তরে কৃতিত্ব নিয়ে বসে থাকেন। আমাদের ঘরের ছেলেকে অপদস্থ করে, কর ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেটের দল কিনে ব্যবসা করেন একজন আর আমরা টিকিট কিনে, গলা ফাটানিয়া সিংহনাদে তাঁর টিমকে সমর্থন করি, তার বিজয়োল্লাসে মাতি, বেসুরো গাইলেই, চোপ্‌রাও! তুমি ব্যাটা গদ্দার! কোলকাতার জন্য তোমার প্রাণ কাঁদেনা! নাই বা থাকল কেউ কোলকাতার ছেলে, তোমার ঘরের ছেলেরা অন্য দলে জল বইবে, সুযোগ না পেলে বয়েই গেল। এই ইডেন এক দিন বলেছিল, 'নো মুস্তাক , নো ক্রিকেট'। সত্যিই আমরা বড়ই সহনশীল হয়ে গেছি। আজ তিনি থাকলে কী আমরা ক্ষমা পেতাম? হতেন না হয় প্রৌঢ়, ধার ত' কমত না। সাথে ত' থাকতেন আরেক কবীর কবিয়াল, এই ত সেদিন দিল্লি গিয়ে আমাদের মাথা উঁচু করে দিয়ে এলেন।


আমাদের উপপদ এর সরঞ্জাম গুলি

আপনার মন্তব্য



শেষ পাওয়া এই বিভাগের খবর

জনপ্রিয় খবর গুলি