রবিবার - কলকাতা



কালপুরুষ

Added by Sayak Aman, Posted on 2015-04-21,11:37:30 a

Ratings :
Rate It:


                                                       কালপুরুষ

-           সায়ক আমান

ভোররাতে আবার স্বপ্নটা দেখে ধরফরিয়ে উঠে বসলাম।টেবিল এর উপর থেকে জলের গ্লাস তা হাতে নিয়েও খেলাম না।মাথাটা ভার হয়ে আছে।ইদানীং লক্ষ্য করেছি যখনই স্বপ্নটা দেখি এই মাথা ব্যাথা টা শুরু হয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ ঠায় বিছানার উপর বসে থেকে আমি গায়ের উপর থেকে চাদর সরিয়ে ফেললাম। যত দিন যাছে এই একটা স্বপ্নই যেন বারবার ফিরে আসছে আমার ঘুমের মধ্যে। আগে মাসে একবার, ইদানীং সপ্তায় একবার করে আমি একই স্বপ্ন দেখি। কিছু যেন বলতে চায় স্বপ্নটা। একটা ঘটে যাওয়া ইতিহাস। যতবারই দেখি মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে আড়মোড়া ভাঙলাম। একটু আগে বোধয় একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাইরে গাছের মাথা গুলোতে গাড় সবুজ রঙ ধরেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় সাড়ে ৯ টা বাজতে চলেছে। সায়ন্তন এখুনি এসে পড়বে। আমি রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের ব্যাবস্থা করলাম। শুধু ঘুমের মধ্যেই না, সারাদিনের কাজের মধ্যেও ঘুরে ফিরে আসে দৃশ্যগুলো। কতগুলো ছেড়াছেড়া ছবি। অর্থহীন কয়েকটা শব্দ। তাও সবকিছুর মধ্যে কিসের যেন একটা যোগসূত্র আছে। লোকে বলে ভোররাতের স্বপ্ন সত্যি হয়। আমার কিন্তু মনে হয় স্বপ্নটা ভবিস্বতের নয়, অতীতের। যেন আমার হারিয়ে যাওয়া সৃতি। কথা গুলো আমার মনে পড়া খুব জরুরি। কিন্তু এতবার দেখেও আমি বিশেষ কিছু বুঝতে পারিনি। কাঠের উপর নখের আঁচরের শব্দ, একগোছা হাতে লেখা কাগজ, একতা দোতলা পুরনো ধাঁচের বাড়ি। এসব ঘুরে ফিরে আসে স্বপ্ন টায়। কোনটা আগে কোনটা পরে তা আমার ঠিক মনে পরে না। শুধু সবশেষে ঘন অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা শীর্ণ ক্ষতবিক্ষত হাত খোলা আঙ্গুল গুলোকে আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমার অবচেতন মনে বারবার মনে হয় কি একটা ভুল, একটা মারাত্মক ভুল করেছি আমি, কিন্তু সেটা কি তা আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না। প্রথম প্রথম ব্যাপার তাকে অত গুরুত্ব দিয়নি। কিন্তু যত দিন যাছে আমাকে যেন গ্রাস করছে স্বপ্নটা। বুঝতে পারছি ওই হাতের আঙ্গুল গুলো আমার স্বাভাবিক জীবনের শান্তি ভেঙ্গে খানখান করে দিছে।

 

দরজায় খটখট আওয়াজ হতে আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে দিলাম। সায়ান্তন একগাল হাসি নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “ তোর প্রবলেম সল্ভড।“

আমি চেয়ারটা টেনে তাকে বসতে নির্দেশ করে বললাম,” প্রবলেম বলতে?”

“ ওই যে স্বপ্নের ব্যাপারটা, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল...”

আমি তাকে মাঝপথে থামিয়ে বললাম,” তোদের ওই psychoanalysis এর theory  তোদের কাছেই রেখে দে। চা খাবি?”

সে হাসতে হাসতে রোল করা একটা কাগজ আমার সামনে বিছিয়ে দিল,” দেখত, চিনতে পারিস কিনা।“

আমি নিচু হয়ে কাগজ টা হাতে তুলতেই চমকে গেলাম। কাগজ টায় একটা বাড়ির ছবি কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট করা আছে। অবিকল আমার স্বপ্নে দেখা বাড়িটার মত, না মত নয়। একদম সেই বাড়িটাই। যেন আমার স্বপ্ন টাকে কম্পিউটার এ ফেলে প্রিন্ট করেছে কেউ। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,” এটা ক্যামেরায় তোলা?”

“নাহ, ইন্টারনেট এ পুরনো একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম, স্কেচ আর্টিস্ট কে দিয়ে তোর স্বপ্নে দেখা বাড়িটার যে স্কেচটা বানিয়েছিলাম না, সেটা রাখা ছিল সামনেই। হঠাৎ দেখলাম ঠিক ওরকমি একটা বাড়ি, হুবহু, কোথাও একটুও ফারাক নেই...।ব্যাস... বুঝলাম, কই চা নিয়ে আয়।“

ছবিটার দিক থেকে চোখ না ফিরিয়ে জিগ্যেস করলাম,” কোথায় বাড়িটা?”

“পুরুলিয়া, ঠিকানা রেডি আছে, কালই রওনা দেব।“

শায়ান্তন ঘোষ পেশায় psychologist। উত্তর কলকাতার কোথায় একটা চেম্বার ও আছে। স্কুল লাইফ টা দুজনে একসাথেই পড়াশোনা করেছি। তারপর বছর পাঁচেক আর যোগাযোগ নেই। মাসদুইয়েক আগে শিয়ালদা station  এ দেখা। একরকম টেনে হিঁচড়েই নিয়ে এলাম বাড়িতে। স্কুল এ পড়ার সময় ভদ্র ও শান্ত বলে একটা কুখ্যাতি ছিল। এখন দেখলাম সে ভাব খানিকটা কমেছে। সে মনস্তত্তে হাত পাকিয়েছে শুনে খুশি হয়েছিলাম। আমার স্বপ্নের কথাটা বলতেই দেখলাম তার চোখে মুখে ডাক্তার সুলভ বিজ্ঞ ভাব ফুটে উঠল। তখন থেকেই বোধয় সে আমাকে পুরনো বন্ধুর বদলে রোগী হিসেবে দেখছে। Freudian psychoanalysis, Transferency প্রভিতি বিভিন্ন তাত্বিক জ্ঞান দেওয়ার পর বলল “ আমার কি মনে হয় জানিস?”

“ কি?” আমি তাপ উত্তাপ দেখালাম না।

 

সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে বলল “ ব্যাপারটা তোর ছোটবেলার কোন trauma থেকে হতে পারে। মানে তোর ছোটবেলার দেখা কোন সৃতি তুই ভুলে গেছিস অথচ তোর subconscious  মাইন্ড এ সেটা থেকে থেকে অন্য রূপে হানা দিছে।“

অনেক কাল আগে এরকম একটা বই পড়েছিলাম। sleeping murder, Agatha Christie র লেখা। সেখানেও ঠিক এরকমই একটা ঘটনা ঘটত। প্রথমটা মনে হবে ভৌতিক উপন্যাস পড়ছি, পরে দেখা যাবে... যাক গে সেকথা, শায়ান্তন ভাবনা চিন্তা করে বলল “ একবার আমার চেম্বার এ আসিস তো, এরকম কেস বড় একটা পাওয়া যায় না।“

তার চেম্বার এ আমি যাইনি। উলটে সেই থেকে থেকে আমার ফ্ল্যাট এ হানা দেয়। এটা সেটা জিজ্ঞেস করে। নোট নেয়। মাঝে মধ্যে hypnosis  করার চেষ্টাও করে। তাতে কিছুই লাভ হয় না। আমার স্বপ্নের অত্যাচার দিনদিন বাড়তে থাকে। সাথে পাল্লা দিয়ে মাথা যন্ত্রণা। একেক সময় বিছানায় শুয়ে কাতরাই। কাল সন্ধেয় সে বলল আশ্চর্য একটা খবর আছে। সকালে যেন আমি বাড়িতেই থাকি। অতঃপর আজ সাত সকালে তার এই আবির্ভাব।

বাড়িটার নাম ম্যান্টন হাউস । হুগলী জেলার এক ধার ঘেসে ছোট্ট গ্রাম মিনামুখি,সেখানে একমাত্র পাকা বাড়ি এই ম্যান্টন হাউস,শোনা যায় সেতা নাকি সাহেবি আমলে তৈরি,কুড়ির দশকে বিপ্লবী আন্দোলনে তাড়া খেয়ে এসে হেনরিক ম্যান্টন বলে এক সাহেব নাকি বানিয়েছেন বাড়িটা। অবশ্য সে বাড়ীতে তিনি বেশীদিন থাকেননি। এখানকার পাত্ তাড়ি গুটিয়ে বিলেত যাত্রা করেন। তার আগে বাড়িটা বেচে দিয়ে যান রবার্ট হিল নামে আরেক সাহেবকে।এই রবার্ট হিল নাকি পেশায় ছিলেন বিজ্ঞানী।এখানকার লোকেরা তাকে বব সাহেব বলে ডাকত। লোকটার ব্যাবহার খারাপ ছিল না,তবে ওই একটু পাগলাটে গোছের। বন্যার সময় দু-একজন গ্রাম বাসিকে বাড়িতে থাকতেও দিতেন। ম্যান্টন হাওস ছিল দোতলা,একতলায় তিনি নিজে থাকতেন আর দোতলায় তার গবেষণা চলত। আশ্চর্যের ব্যাপার হল ষাটের দশকে গোড়ার দিকে একদিন হঠাৎ করে তিনি বাড়ি ছেরে বেপাত্তা হয়ে গেলেন।বয়স হয়েছিল ভালই, লোকেরা ভাবল মাঠে ঘাটে মরে পড়ে আছে।কিন্তু না,সেখানেও কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। তারপর থেকে খুব বেশি লোক সেখানে থাকেনি।গ্রামবাসিরা বাড়িটার যত্ন নেয়।বেশি জিনিস পত্র বাড়িতে নেই,কিছু পুরনো আসবাব,আর সাহেবের বই টই কিছু থাকতে পারে।

আমরা ম্যান্টন হাউসের সামনে যখন পৌছলাম তখন সন্ধে পার হয়ে গেছে।আমরা বলতে আমরা আর সায়ান্তনের বারির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা হুলু।আসার পথেই সে জানিয়ে দিয়েছে তার আসল নাম হলধর, তনে এই খানে কেউ তাকে অই নামে চেনে না।হুলু বললে এক ডাকে চিনবে। মোটা তাকা বকসিস দিতে হয়েছে তাকে, তবে লোকটা খারাপ না।আমাদের আনতে স্তাতিওন পর্যন্ত গেছিল।আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম –“এইখানে থাকা যাবে তো?”

সে মাথা নাড়ল,”আমি তো থাকি,আপনারা কলকাতার লোক,তবে শীতকাল কিনা তামন কস্ত হবেনা আসুন এদিকে”

এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি বাড়িটা কিন্তু মতেও ভুতের বাড়ির মত দেখতে নয়।চারপাশ মতেও ভেঙে পরেনি তবে জায়গাটা অপরিষ্কার,দু একটা ঝোপঝাড় বাড়িটার চারপাশ ঘিরে রয়েছে,তবে সেটুকু থাকাই ভাল।বেশ একটা ইতিহাসের গন্ধ পাওয়া যায়।আমরা যে এই বাড়িটায় দু-একদিন থাকতে চাই সেটা শুনে হলধর প্রথমে বেশ বিস্ময় প্রকাশ করেছিল।এখানে দেখার মত কিছু নেই,বাড়িটা হানাবাড়ি বলেই কুখ্যাত নেই,উল্টে থাকা খাওয়ার অসুবিধে। তবে তার কথায় জানতে পারলাম এখানে নাকি একটা  পুরনো সাহেব আমলের graveyard আছে। আগে যখন এখানে সাহেব কলোনি ছিল তখন তাদের সমাধি হত সেখানে,কবরের সংখ্যা সব মিলিয়ে পচিসের বেশী নয়,আমারা যদি দেখতে চাই সে নিয়ে যেতে পারে।

বাড়িতে ঢুকে সায়ান্তন আমায় জিজ্ঞেস করল-“কীরে কিছু মনে পড়ছে নাকি?আগে এসেছিস এখানে?

আমি চারপাশ তা দেখতে দেখতে বললাম “নাহ,কিন্তু বাড়িটা হুবহু এক।“

‘হুম থাক্‌ কটা দিন,দেখ কিছু রিলেট করতে পারিস কিনা,না পরলেও মন্দ নয়,কলকাতার ধুলো ময়লা চিৎকার থেকে দুরে শান্তিতে কটা দিন কাটালে তোর স্বপ্ন বাবাজি  এমনিতেই পলায়ন করবে।“

প্রথম দিনটা আমরা বাড়িতেই কাটালাম,দোতলাটা তুলনায় খানিকটা পরিস্কার,বব সাহেবের বইয়ের ঘর টাও দেখলাম,বেশিরভাগই গবেষনা সংক্রান্ত বই,তবে সংখ্যায় বেশি না,গোটা আটেকের মত,একটা জারলাল অ আছে,তাতে সাহেব কি নিয়ে গবেষনা করছিলেন সেটা বোঝা যেতে পারে।তবে এবেলা ক্ষীণ আলোয় সেটা পড়ার ইচ্ছা হল না আমাদের।সন্ধে আরও হয়ে আস্তে হলধর দুটো হ্যারিকেন জ্বেলে দিল,তারপর আমরা চায়ে চুমুক দিতে দিতে তার মুখে গ্রামের ইতিহাস শুনতে লাগ্লাম,ইতিহাস অবশ্য বেশি কিছু না,আমার কিছুই চেনা লাগলো না,এক বাড়িটা ছাড়া।সায়ান্তন হঠাত তাকে প্রশ্ন করল,”আচ্ছা এখানে কোনো খুন হয়েছে কখনও?”

আমি মনে মনে হাসলাম,এখানে আসার আগে তাকে স্লিপিং মার্ডার তা পড়তে দিয়েছিলাম,সেটার রেশ বোধ হয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি,হলধন একগাল হেসে বলল “না না খুন টুন এখানে কিচ্ছু হয়নি,তবে বব সাহেব যে কোথায় হারিয়ে গেলেন তার আর কোনো খবর পাওয়া গেলনা,সেটাকে যদি খুন বলেন।।”

“হুম,আচ্ছা সাহেব কে তুমি দেখেছিলে?”

“না,আমি জন্ম থেকেই দেখছি বাড়ি ফাঁকা,খানিকটা লেখা পড়া শিখেছি বলে মাস মাইনে তে এখানে কেয়ার টেকার

থাকি,নাহলেই ত বাড়িটা মদোমাতালের আড্ডা হয়ে যাবে।”

আমি হ্যারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোর দিকে তাকিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম “বব সাহেব কি নিয়ে গবেষনা করছিল সে বিষয়ে কিছু জান?”

“না,দাদাভাই,গ্রামের লোকজনের কি পেটে অত বুদ্ধি থাকে যে অত কথা জানবে?তবে শুনেছি তার কিছু বন্ধু ছিল অই সাহেব কলোনি থেকেই,তাদের সাথেই সেসব নিয়ে আলোচনা হত,সে যাই হক্‌,খুন খারাপি যখন হত না,গ্রামের লোকেদেরও অনিষ্ট হয়নি কোনোদিন।”

রাত্রি বেলা চিরে গুর খেয়ে আমরা মেঝেতে বিছানা পেটে শুয়ে পরলাম। এ বাড়িতে খাটের ব্যবস্থা নেই। মশার উৎপাত নেই বলে আমরা ওডমস্‌ মাখলাম না,আমি শুয়ে পরলাম সায়ান্তন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবতে লাগল। আমি বিশেষ গুরুত্ব দিলাম না।সারাদিনের ট্রেন জার্নি তে শরীর ক্লান্ত ছিল,পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পরলাম,মেঝের উপর কান রাখতেই মনে হল কোথা থেকে যেন এক্তা ক্ষীণ চিৎকার আসছে,খুব খুব ক্ষীণ তবু শোনা যায়,মনে হল একজন নয়,অনেক মানুষ যেন একসাথে গোঙাচ্ছে ,খাটের উপর আচ্ছারানোর শব্দ,সেই কাগজের একটা নোট পেপার, রাতের ঝলমলে আকাশে ফুটে উঠছে কয়েকটা বিন্দু, একটু একটু করে বেরে উঠছে সেগুল, সেই শীর্ণ শুকিয়ে যাওয়া হাত টা আঙুল তুলছে আমার দিকে,যেন কি একটা মারাত্মক কাজ করেছি আমি,আমি চিৎকার করে উঠতে গেলাম কিন্তু শব্দ গলাতেই আটকে গেল।সেই হাত টা ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে,না আমি এগিয়ে যাচ্ছি তার দিকে,একটু একটু  করে কাছে...আরও কাছে...

সকালে আমরা গ্রাম দেখতে বেরলাম।সাথে কবরস্থান টাও।গ্রামটা বেশি বড় নয়।তার একটা কারন এখানে আসা যাওয়ার একটু অসুবিধা আছে।নদী পেরিয়ে নৌকা করে আসতে হয়।চারিদিকে অগোছালো গাছপালার জঙ্গল, আসা যাওয়ার পথে দু একজন গ্রামবাসীকে দেখা গেল।আমাদেরকে এখানে উঠতে দেখে তাদের চোখে মুখে কৌতূহল ফুটে উঠল।দু একজনের সাথে কথাও বলল হলধর।আমরা ঠিক কি কারনে এখানে এসেছি তা অবশ্য সে বলতে পারল না।গোটা গ্রামটায় গাছপালা আর হালকা জঙ্গল ছাড়া দেখার মত কিছু নেই।এমনকি পাশেই যে সাহেব কলোনি এক সময় ছিল, সেটারও বিশেষ কিছু চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। আমার যে এখানে এসে নতুন কিছুই মনে পরেনি তাতে বেশ নিরাশ হয়েছে সায়ন্তন। আমার ছোটবেলায় তেমন বড় কোন trauma গেছে কিনা সেটা জানতে সে আমার দেশের বাড়ি পর্যন্ত খবর নিয়েছে, কিন্তু শেওড়াগাছের উপর থেকে ঝাপিয়ে ব্রম্ভদইত্যির ভয় দেখিয়ে এক বন্ধুকে অজ্ঞান করে দেওয়া ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। বলতে গেলে নিরবিঘ্নেই কেটেছে আমার শৈশব। অতয়েব ফ্রয়েদ সাহেব কিছু সাহায্য করতে পারেননি।

 

ঘুরতে ঘুরতে আমরা cemetery  তার সামনে এসে পড়লাম। এন্ট্রান্স এর মুখটায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা পাথরের একটা স্তূপ। তার উপর আগাছার জঙ্গল ঝুঁকে এসেছে, তারি ফাঁক দিয়ে সরু একফালি পায়ে চলার রাস্তা। বাইরে থেকে ভিতরের বেশ খানিকটা দেখা যায়। রাস্তার দুপাশ জুড়ে উঁচু পাথরের বেদি। বাইরের ভাঙ্গা দেওয়ালের উপর একটা এলিজি লেখা আছে।

আমরা তিনজনে ভিতরে ঢুকে এলাম। পাথরের দেওয়ালটা পেরোতেই কিন্তু আমি ব্যাথায় ককিয়ে উঠলাম। তীব্র যন্ত্রণাটা হথাৎ করে মাথার প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে পড়েছে। যেন একটা আস্ত মৌমাছির চাকে ঢিল ছুঁড়েছে কেউ। আমি সায়ন্তন এর কাঁধ চেপে ধরলাম। সে আমার দিকে ফিরে কিছু একটা জিগ্যেস করল। আমি ঠিক শুনতে পেলাম না। কেমন জানি একটা স্থির বিশ্বাস জন্মাচ্ছে এই cemetaryর ভিতরেই কিছু একটা আছে। হয়ত আমার প্রশ্নের উত্তর। আমি এগোনোর চেষ্টা করলাম। যেভাবেই হোক ভিতরে যেতেই হবে। মুখে বললাম “ কিছু হয়নি, চল।“

চারপাশে tombstone ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্বভাবতই সেগুলো বেশ পুরনো। পাথরের ফলকের উপরে সেওলা আর আগাছা জন্মেছে। সবকটা পড়াও যায় না। কয়েকটার উপর সিমেন্টর বেশ বড় স্তম্ভ। গাছের উপর দিকে কয়েকটা বাদুড় উল্টো হয়ে ঝুলে আছে। মাটিতে শুকনো পাতার উপর পা পরে খসখস আওয়াজ হছে। হলধর মাঝে মধ্যে এটা সেটা দেখিয়ে পুরনো দু একটা গল্প বলছে। সেগুলো কতটা সত্যি আর কতটা জল মেশান তা আমি বলতে পারি না। বোধয় বেশি বকশিশ পাওয়ার লোভে তার কল্পনা শক্তির ঝাঁপি উজাড় করে দিছহে। আমার মন কিন্তু সেদিকে নেই। কিছু একটা আছে, হ্যাঁ আমি নিশ্চিত এই কবর গুলোর মধ্যেই নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে। আমার স্বপ্নের অবচেতন থেকে কে যেন বলে চলেছে, আমি ঠিক রাস্তাতেই যাচ্ছি। খানিকটা দূর গিয়ে রাস্তা টা বাঁক নিয়েছে। সেখান থেকে আবার tombstone  এর সারি। হলধর হঠাৎ একদিকে দেখিয়ে বলল “ ওই কবর টা দেখছেন তো?”

আমরা সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম সেটা কবরের ভাঙ্গা পাথরের একটা অংশ। যেন কিছু একটা এসে পড়ায় পাথরটা ভেঙ্গে ছিটকে গেছে। সায়ান্তন বলল “ কি ওটা?”

 

“ওটার উপর একটা উল্কা এসে পড়েছিল।“

“উল্কা!” আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম “এত বড় উল্কা পড়েছে! কবে?”

“তা প্রায় বছর পঞ্চাশেক আগে। এ গ্রামে তার আগে কেউ উল্কা পড়তে দেখেনি। বব সাহেবের মুখেই সবাই জানল ওটাকে উল্কা বলে।“

আমার বেশ মজা লাগ্ল। বললাম “ তোমাদের এই বব সাহেব লোকটা লালমোহনবাবুর ভাষায় যাকে বলে হাইলি সাস্পিসাস, উল্কা থেকে এলিএন তেলিএন খুজে মহাকাশে পাড়ি দেননি তো?”

গ্রাম দেখা শেষ হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। এখানকার মানুষজন বেশ ভাল। তবে একটু মুখচোরা গোছের। হলধর বলল মোটামুটি সপাঁচেক টাকা খরছ করতে পারলে পরের দুট দিন আমাদের রান্নাবান্নার চিন্তা আর করতে হবে না। তারাই এসে খাবার দিয়ে যাবে। সেই মতই ব্যাবস্থা হল। আমরা মানটন হাউস এ ফেরার উপক্রম করলাম। হলধর বলল সে একটু পরে আসবে। হারিকেন এর তেল নিতে হবে। তাছাড়া তারও গ্রামে সংসার ধর্ম আছে। রাস্তা তো সোজাই আমাদের চিনতে অসুবিধে হবে না। অগত্যা আমরা ফেরার পথ ধরলাম।

রাস্তা সোজা হলেও মানটন হাউস অন্তত আধ ঘণ্টার হাঁটা পথ। আমরা কাঁচা রাস্তার উপর দিয়ে ধীরে সুস্থে চলতে লাগলাম। হঠাৎ সায়ান্তন আমার হাত চেপে ধরে উপর দিকে তাকিয়ে বলল “ উপরে দেখ।“

আমি উপরে তাকিয়ে দেখলাম রাতের কালো আকাশের গায়ে প্রচুর জ্বলন্ত বিন্দু যেন একটু একটু করে বড় হছে। ঠিক তারার মতই। কিন্তু তারা তো অত বড় হয় না। তাহলে কি আজও উল্কাপাত হবে এখানে? আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। মাথার ঠিক উপরেই কালপুরুষ হাতে তির ধনুক নিয়ে আকাশের গায়ে শুয়ে আছে। তার চারপাশ ঘিরে ঝলমল করছে অগুনতি তারার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঝাঁক। হঠাৎ আমার মনে হল আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ওই আকাশের গায়েই আছে। ওই খসে পড়া উল্কা গুলোর মধ্যে। জিগ্যেস করলাম “ উল্কা কেন পড়ে বলতে পারবি?”

সায়ান্তন আকাস থেকে চোখ না ফিরিয়ে বলল “ নাহ, এ ব্যাপারে আমার পেটে বিদ্যা নেই। “

আমি বললাম “ বিস্ফোরণে ছিটকে আসা গ্রহ বা নক্ষত্রের টুকরো গুলো মহাকাশে বিক্ষিপ্ত ভাসতে থাকে। তারপর ঘুরতে ঘুরতে কোন সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এসে পরলে পৃথিবীর টানে মাটির উপর এসে নামে।বায়ুমন্দলে এসেই ওরা জলে যায়। কি আশ্চর্য! ভেবে দেখ যদি ওদের প্রান থাক্ত। মৃত্যুর পরেও ওদের শান্তি নেই। ধংস হবার কি অমোঘ বাসনা। জ্বলন্ত শরীর নিয়ে যতক্ষণ না পৃথিবীর বুকে আছড়ে  পড়ে শেষ হছে ওদের ভৌতিক জীবন থেকে নিষ্কৃতি নেই। “

সায়ান্তন মুখ নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ সেই উল্কা পড়ে ভেঙ্গে যাওয়া কবরটা দেখে তোর কি কিছু মনে পড়েছে?”

আমি ঘাড় নাড়লাম “না, তবে এই রাতের আকাস টা আমি আগেও দেখেছি, বহু বছর আগে।“

“রাতের আকাস আগে সবাই দেখেছে, এতে নতুন কি আছে?”

“ এ আকাস আজকের পৃথিবীর মানুস দেখেনি, নর্থ পোল ফনিস ১২ ডিগ্রি সরে আছে। সাগিত্তারিওউস এর পলার মুভমেন্ত ৮৬০ ~, ৮৬ এর হ্যালির ধুমকেতু আমরা এখনও দেখিনি, সেটা হতে আর ২৬ বছর দেরি আছে। আকাশের তারা রা মিথ্যে বলেনা। এটা আজকের না, আজ থেকে ৫০ বছর আগের আকাস।“

“কি পাগলের মত বকছিস! কি করে বলছিস তুই এসব?” প্রায় চিৎকার করে উঠল সায়ান্তন।

আমি মাথা নামিয়ে নিলাম, তার একটা হাত রেখে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম “ বলছি, কারন আমি Dr Robert Hill।”

বাকি রাস্তা দুজনে কথা বললাম না,আমাদের কাররই কথা বলার অবস্থা নেই,যত ম্যান্টন হাউসের দিকে এগোচ্ছি তত আমার ভিতরে একটা একটা করে সব প্রশ্নের উত্তর ফুটে উঠছে , প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগছে আমার,বাড়িতে ঢুকে দেখলাম হলধর আমাদের আগেই পৌঁছেচে,সায়ান্তন তাকে দু কাপ চা পাঠাতে বলল,আমরা উপরের ঘরে চলে এলাম

টেবিলের একপাশে চেয়ারে বসলাম আমি আর একপাশে সায়ান্তন,সে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমার দিকে,আমি অল্প হেসে বললাম “একটা কথা বললে বিশ্বাস করবি?”

“কি” সে যতটা সম্ভব নিরুত্তাপ গলায় প্রশ্ন করল।

আমি মাথা নামিয়ে নিচু গলায় বললাম “যদি বলি এ শতাব্দির সব থেকে বড় শয়তানি,সব থেকে বড় পাপ তা করেছিল রবার্ট হিল,আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে,এই গ্রামের এই ছোট্ট বাড়িতে বসে।”

“করব,কিন্তু আগে বল তুই সেসব জানলি কি করে?”

“সেটা জানিনা,এমন কি রবার্ট হিলের শেষ পরিণতিও আমি জানিনা,হয়ত আর জানা সম্ভবও না।”

“তুই বলছিস রবার্ট হিল তোর পূর্ব জন্ম?”

“তাও বলছি না।”

আমি চেয়ার থেকে উঠে একটা সিগারেট ধরালাম,পিছনের জানলা টা খোলা ছিল,সেদিকে হাটতে হাটতে বললাম “আচ্ছা, এ শতাব্দির সব থেকে বড় পাপটা কি?খুন,sabotage,mass murder?নাকি ৪৫ এ জাপানে নিউক্লিয়ার attack?”

“লোকে তো তাই বলে।”

“না,আরো একটা আছে ,যদিও এটার কথা পৃথিবীতে আর কেউ জানেনা।জানতে পারবেও না।”

সায়ান্তন আর কিছু বলল না,আমি জানলার গ্রিল ধরে বলে চললাম “Journal গুলো পড়লে জানতে পারবি হিল সাহেবের গবেষণার বিষয় ছিল 42. P lepidium বলে একটা compound আবিস্কার করা,এই compound-এর কাজ হল জীবদেহে হার্ট ও অন্যসব অরগ্যানের কার্যকারিতা স্বাভাবিকের থেকে বেশ খানিকটা বারিয়ে দেওয়া,কাজে বেশ কিছুদূর এগিয়েছিলেন তিনি,হঠাৎ মাথায় অন্য এক ভূত চাপে,কৃত্তিম উপায়ে মানুষের জীবনকাল বাড়িয়ে তোলা,দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়ে কোন লাভ হচ্ছিল না,উপর ওয়ালা মানুষের হাতে এই ম্যাজিকটা দিতে কিছুতেউই রাজি নয়,সাহেব প্রায় হাল ছাড়ার মুখে,এমন সময়ে একটা ঘটনা ঘটল,একটা উল্কা এসে পড়ল এই গ্রামেই,বেশ বড়সড়,সেটা পরীক্ষা করে দেখতে গিয়েই প্রবীণ বিজ্ঞানীর চোখ কপালে উঠল।উল্কার গায়ে  এমন কিছু element এর চিনহ আছে যা মেন্ডেলিফ তার periodic table ও বলে যাননি।এই সমস্ত element এর sample আর lepidium নিয়ে ভদ্রলোক একটা ওষুধ তইরি করলেন,ধরে নে একটা ভাইরাস,যেটা কৃত্তিম উপায়ে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করতে পারে,আর সেটাই হল পাপ,সব থেকে বড় পাপ।

সায়ান্তন এতক্ষণ হা করে শুনছিল এবার আমি থামতে মুখে একটু হাসি এনে বলল “সে ওষুধ এখন কোথায়?”

আমি জানলার গ্রিলে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে বললাম “airbone droplet virus, r0 number 6. মাঝখানে কেটে গেছে ৫০ বছর , সে ভাইরাস এখন তোর আর আমার শরীরে।”

এবার সে টেবিল ছেরে উঠে দাঁড়াল আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল “থামা পাগলের প্রলাপ,কাল সকালেই কলকাতায় ফিরব আমরা,তোর চিকিৎসা দরকার।”

“গিনিপিগের উপর সে ভাইরাস কাজ করেনি দেখে খুব হতাশ হয়ে ছিলাম,কিছুদিন পড়ে সেটা এমনি মরে গেল আমার চমক অপেক্ষা করছিল তার পরে, জীবিত অবস্থায় এ ভাইরাস কাজ করে না। মৃত্যুর কয়েক বছর পর থেকে ভাইরাস কাজ করা শুরু করে শরীরে,একটু একটু করে প্রাণ সঞ্চার করে, শুকিয়ে যাওয়া চামড়ায় আ

লিখেছেন Sayak Aman


Message Lekha Somorgro

আপনার মন্তব্য



Submit Your Writings

নতুন লেখালিখি গুলি

জনপ্রিয় লেখা গুলি