সোমবার - কলকাতা



আজ নিলুর বিয়ে

Added by আনিসুজ্জামান সৌরভ, Posted on 2014-10-20,01:58:33 p

Ratings :
Rate It:


(১)

হারাগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জনাব আনিস উদ্দিন তালুকদার বি.এস.সি. গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তাঁর মেজাজ অত্যধিক খারাপ। আজ সকালে তিনি জানতে পেরেছেন তার কনিষ্ঠ পুত্র নেশায় আসক্ত।মেজাজ খারাপের কারণ অবশ্য এটা না। তাঁর বড় মেয়ে নিলুরবিয়ে ভেঙে গেছে। গত মাস থেকেই বিয়ের আলাপ আলোচনা চলছিল। বরপক্ষের লোকজন দুই দফা পাত্রী দেখে গেছেন। শুরু থেকেই কথাবার্তা স্পষ্ট ছিল। অবশেষে আজ সকালে আনিস সাহেব তাঁর কোনো এক বন্ধু মারফত জানতে পেরেছেন ছেলে বিরাট এক রোগ রক্তে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।এইচআইভি পজিটিভ। ব্যাপারটা নিয়ে তিনি হারাগাছা বাজারের বিশিষ্ট পল্লী চিকিৎসক তরুকান্তের(এল.এম.এ.এফ) সাথে কথা বলেছেন। তরুবাবুর বক্তব্য মতে রোগটা বিদেশ থেকে রক্তে করে নিয়ে এসেছে এবং এই রোগ ভাল হবার কোন সম্ভাবনা নাই। সেই থেকেই তিনি ভাবছেন এত কঠিন একটা রোগের কথা পাত্রপক্ষ চেপে গেলেন।কত বড় সাহস? তাঁর মত এমন একজন সম্মানীয় ব্যাক্তির সাথে এই ধরনের জোচ্চুরি তিনি মানতে পারছেন না।

(২)

বিয়ে ভেঙে যাবার পর থেকে বাড়ির অবস্থা অস্বাভাবিক। অথচ বাড়ির সবাই এমন ভাব করছে যেন সব কিছুই স্বাভাবিক। সবাই অভিনয় করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিলুদের বাড়ির কেউ অভিনয়ে পারদর্শী নয়। এই কারনে সবাইকে অস্বাভাবিক লাগছে। শুধু নিলু ব্যাতিক্রম। সে এই মুহুর্তে সোফায় পা তুলে বসে তেঁতুলের আচারখাচ্ছে। বিয়ে ভাঙ্গারপর মেয়েরা কারণ ছাড়াই উদ্ভট কর্মকান্ড করে।নিলুর মধ্যে বিয়ে নিয়ে কোনরকমপাগলামি দেখা যাচ্ছেনা। তাঁর পিতার ধারণা তার মেয়ে সাধারণ কোন মেয়ে নয় সাক্ষাত পরী আর পরীরা কোন ভুল করে না। তার মেয়েও করবে না।আনিস সাহেবের তিন মেয়ের মধ্য নিলু সবার বড়। এ বছর এইচ.এস.সি. দিয়েছে। তাঁর এই মেয়ে রুপবতী। সবচেয়ে বড় কথা গায়ের রঙ ভালো। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর এই মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতে হবে না। এখন করতে হচ্ছে। মানুষের সব ভাবনা সবসময় ঠিক হয় না। তিনি মেয়ের চেয়ে নিজের স্ত্রী মাজেদা বেগমকে নিয়ে বেশি দুঃ শ্চিন্তায় আছেন। মাজেদা বেগম সামান্য উত্তেজিত হলেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তবে আজ তার স্ত্রীও স্বাভাবিক আছেন।

(৩)

নবু মামা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। আজ সকালে তার মেজবুবু টেলিফোন করেছিলেন। তাঁর অতি আদরের ভাগ্নি নিলুর বিয়ে ভেঙে গেছে। তাকে দ্রুত আসার জন্য বলেছে। নবু মামা আনিস সাহেবের একমাত্র শালা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স করে এখন বেকার।অবশ্য নবু মামা নিজেকে কখনোই বেকার ভাবেন না। কেননা তিনি সবসময় কোনো না কোন কাজের মধ্য লেগে থাকেন। তাঁর ধারণা যারা কাজ করে তারা কখনো বেকার হতে পারে না। সিগারেট শেষ করে নবু মামা গম্ভীর মুখে বসে ভাবছেন।তার সামনে বসে আছে তার বাল্য বন্ধু মতিন। নবু মামা স্কুলে পড়ার সময় থেকে সিগারেট ধরেছে, মতিন আজ পর্যন্ত একটান সিগারেটখায়নি। নবু মামার ধারণা যারা সিগারেট খায় তাদের বুদ্ধি বেশি হয়ে থাকে। তাই মতিনের বুদ্ধি খুব কম। জীবনের কঠিন সময়ে মতিন নবু মামার সাহায্য নেয়। মতিনের ধারণা তার বন্ধু নবু জাদু জানেন এবং সেই জাদুর দ্বারা যা ভাবেন তাই করতে পারেন। নবু মামার মাথায় এখন বিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। নিলুর বিয়ের কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন।

(৪)

নিলুর মন আজ উৎফুল্ল। কারণ তার নবু মামা তাদের বাসায় এসেছে। নিলু নবু মামার ভক্ত। অনেক কিছু সে তার মামার কাছ থেকে শিখেছে। নবু মামা বারান্দায় বসে  সিগারেট টানছেন।নিলুর মতে, নবু মামা আগে থেকে অনেক কিছু ধারণা করতে পারেন।

নবু মামা বলল, কিছু বলবি?

নিলু বলল, চা খাবে মামা? এক কাপ চা নিয়ে আসি? কড়া করে। চিনি বেশি দিয়ে।

এখন চা খেতে ইচ্ছা করছে না। তোর সাথে কথা আছে।

তুই কি কাউকে পছন্দ করিস?

কেন মামা?

বিয়ে ভেঙে গেলে মেয়েরা কত উদ্ভট কর্মকান্ড করে। তোকে তেমন মনে হচ্ছে না তাই জিজ্ঞেস করলাম।

নবু মামার ধারণা ছিল সুন্দরী মেয়েরা বোকা হয়। নিলুকে দেখে তার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। নিলু অতি বুদ্ধিমান মেয়ে।

মামা তোমার টগরের কথা মনে আছে?

কোন টগর?

যে ছেলেটা তোকে বিরক্ত করত। দুলাভাই যাকে পুলিশে দিয়েছিল।

নিলুর ধারণা টগর ছেলে হিসেবে খারাপ না। হিমুর মত হলুদ পাঞ্জাবী পরে ঘুরে বেড়ায়।টগরের সাথে নিলুর প্রথম পরিচয় হয়েছিল কলেজের সামনে।হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে রাস্তায় সিগারেট টানছিল। নিলুর বাবা আনিস সাহেব বখাটে ভেবে পুলিশে দিয়েছিলেন।

(৫)

আনিস সাহেবের ধারণা তার অপদার্থ শালা অসাধ্য সাধন করেছে। নিলুর জন্য পাত্র খুঁজে বের করেছে। পাত্র মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। জাহাজে জাহাজে ঘুরে বেড়ায়। পাত্রের বাবার ঢাকা শহরে তিনটা বাসা আছে। পাত্রপক্ষ ঢাকা থেকে আজই আসছেন। পাত্রি পছন্দ হলে আজকেই বিয়ে। আনিস সাহেব প্রথমে ইততস্ত বোধ করলেও রাজি হয়ে গেলেন। প্রথমত, ছেলে দেখতে শুনতে ভাল। ভাল চাকুরি করে। তার মেয়ে সারাজীবন সুখী থাকবে। আনিস সাহেবের মন আনন্দে ভরে উঠল।

সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ পাত্রপক্ষ এসে পৌঁছল। পাত্রপক্ষ বলতে পাত্র, পাত্রের ছোট চাচা আর পাত্রের মা। পাত্রের বাবা ব্যবসার কাজে ব্যস্ত তাই আসতে পারেনি।আনিস সাহেব মনে মনে ভাবলেন তার বেয়াই কি এমন ব্যবসা করে যে ছেলের বিয়েতে আসতে পারেনি। মাজেদা বেগম মেহমানদের জন্য বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও মিষ্টি নিয়ে আসলেন। পাত্রের মার কথা হল পাত্রী পছন্দ হলে একসাথেই মিষ্টি মুখ করবেন। নিলুকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। আনিস সাহেবের ধারণা তার মেয়ে যেমন রুপবতী তেমনি ভাগ্যবতীও। রাত আটটার মধ্য পাত্রী দেখা পর্ব শেষ হল। পাত্রপক্ষের মেয়ে পছন্দ হয়েছে। তারা আজই শুভ কাজ সেরে ফেলতে চান। পাত্রপক্ষ বিয়ের সব জিনিশপত্র গাড়িতে নিয়ে এসেছেন। আনিস সাহেবের ইচ্ছা ছিল তিনি তার বড় মেয়ের বিয়ে খুব ধুমধাম করে দিবেন। মানুষের সব ইচ্ছা পূরণ হয় না।আনিস সাহেবেরও হয়নি। তবে এখন আর তার কোন আফসোস নেই।

(৬)

বিকাল থেকে নবু মামাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। নিলুকে এব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি। আনিস সাহেব শুভদিনে মেয়েকে এমন অশুভ সংবাদ দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি নবু মামাকে খুঁজে বের করার প্রাণান্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। থানা থেকে পুলিশ এসেছে । মাজেদা বেগমের মন অজানা আশঙ্কায় আঁতকে উঠল।বাড়িতে পুলিশ আসার খবর  এতক্ষণে নিলুর কানে পৌঁছল। তাই কণের সাজেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। পুলিশের ভাষ্যমতে, ঘটনা হচ্ছে পাত্রপক্ষের গাড়ি সন্ধ্যায় একজন লোককে ধাক্কা মেরে পালিয়ে এসেছে এবং লোকটি ঘটনাস্থলেই মারা গেছে। লোকটির মানিব্যাগের কাগজপত্র ঘেঁটে নাম জানা গেছে নবীন আহমেদ। একথা শোনার পর মাজেদা বেগম অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান। আনিস সাহেব তার স্ত্রীকে ধরে ঘরে নিয়ে যান। এদিকে পুলিশ পাত্রপক্ষকে থানায় নিয়ে যাচ্ছে।

একমাত্র নিলু কণে বেশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ থেকে বৃষ্টির ফোটার মত অশ্রু টপটপ করে হাতের তালুতে পড়ছে। তার বারবার মনে পড়ছে

 

চা খাবে মামা? এক কাপ চা নিয়ে আসি? কড়া করে। চিনি বেশি দিয়ে।

লিখেছেন আনিসুজ্জামান সৌরভ


Message Lekha Somorgro

আপনার মন্তব্য



Submit Your Writings

নতুন লেখালিখি গুলি

জনপ্রিয় লেখা গুলি