শুক্রবার - কলকাতা



মুখোমুখি অর্পিতা

Written by Pooja Mitra, Posted on 2014-07-09,02:53:07 p

Arpita Das,Independent Fimmaker,Actress,Film Festival

অর্পিতা দাস, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। তিনি স্বাধীন চিত্র পরিচালক ও অভিনেত্রী, আবৃত্তিকার, এবং কবি। এক ঝকঝকে তরুণ মুখ যিনি কিছু করে দেখাতে এসেছেন, এসেছেন নিজের জায়গা করে নিতে। তিনি নিজের মত করে খুব অল্প সময়েই সফলতার মুখ দেখেছেন কিন্তু আজো আছেন আমার- আপনার চেনা আমাদের পাশের বাড়ির মেয়েটির মতন, যার সাথে আলাপ করে, কথা বলে মনে হল যথার্থ অর্থেই তিনি একজন Young Achiever।

weRbangali: Independent Film Maker বলছে তোমার ফেসবুক প্রোফাইল, এর আগের কথা বলো, তোমার পড়াশোনা কোথায়?

অর্পিতা ঃ স্নাতক স্তর জুলজিতে বিধাননগর কলেজ থেকে, স্নাতকত্তর বেথুন থেকে, আর তারপর বি.এড।

 

weRbangali: বাঃ! একজন girl next door যে পড়াশোনা করতে ভালবাসে, যার ফেসবুক প্রোফাইল বলছে সে সৃজনশীল ভাবে লিখতে জানে, সে স্বাধীন চিত্র পরিচালক ও অভিনেত্রী হতে চাইল কেন?

অর্পিতা ঃ আমি খুব ছোটবেলা থেকেই কবিতা ও শ্রুতি নাটক শিখতাম জগন্নাথ বসু, ঊর্মিমালা বসু ও পার্থ বসুর কাছে। শুরু সেখান থেকেই। তারপর দূরদর্শনে ‘ছুটি ছুটি’ বলে একটি অনুষ্ঠানে অভিনয় করার সুযোগ পেলাম আর সুযোগ পেলাম রেডিওতে ‘গল্প দাদুর আসর’ বলে অনুষ্ঠানটিতে যোগদান করার। তারপর, আর একটু বড় হওয়ার পর সুযোগ পেলাম নান্দিকারের সাথে নাটক করার ও শ্রী দেবশঙ্কর হালদারের নির্দেশনায় কাজ করার। এই ভাবেই আস্তে আস্তে জড়িয়ে গেছি, এই ভাবেই স্বাধীন চিত্র পরিচালক ও অভিনেত্রী হয়ে যাওয়া।

 

weRbangali: সৃজনশীলতার প্রতি ঝোঁক তাহলে ছোটবেলা থেকেই। তোমার বাচন ভঙ্গি খুব সুন্দর, স্পষ্ট। এই যে ছোটবেলা থেকে এতজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব সান্নিধ্যে আসা, সেই অভিজ্ঞতা কেমন? আর এই অভিজ্ঞতা কি অভিনয় ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে সাহায্য করে?

অর্পিতা ঃ শ্রুতি নাটক ও কবিতা শেখা ও নান্দিকারে কাজ করার সুযোগ ও শিক্ষাটাই আমার কাছে বড় সম্পদ। শ্রুতি নাটক ও কবিতা শেখা আমার বাচন ভঙ্গিমা ও উচ্চারণ পরিষ্কার করেছে, শিখিয়েছে একটা অনুভূতিকে কত বিভিন্নভাবে প্রকাশ করে যায়। আর, যদিও নাটক ও সিনেমায় অভিনয় করা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি মাধ্যম, কিন্তু নাটক করতে গিয়ে আমার মনটা তৈরি হয়ে গেছিল, ভীতটা তৈরি হয়ে গেছিল। নাটকের মঞ্চ অভিনয় শেখার একটা বড় জায়গা।

 

weRbangali: ‘গল্প দাদুর আসর’ ভীষণ জনপ্রিয় ছিল আমাদের ছেলেবেলায় মনে পড়ে এখনও।ছোট্ট অর্পিতার দূরদর্শন ও রেডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

অর্পিতা ঃ ওগুলো খুব মজার অভিজ্ঞতা আমার কাছে! এত ছোট ছিলাম যে ক্যামেরার বা রেডিওর সামনে দাঁড়ানোয় কোন ভয়-ভীতি কাজ করত না। এত ছোট ছিলাম যে একটা বা দুটোতে পড়তাম। ওরা টেক নিত, আর তারপর বাকি বাচ্চাদের সাথে খেলতে ব্যাস্ত হয়ে যেতাম।

 

weRbangali: ভারি মজার তো! ছোট থেকেই এত কিছুর সাথে যুক্ত, একটা কথা জানতে হচ্ছেই এবার, স্কুল ও বন্ধুদের ভূমিকা কি রকম ছিল? বন্ধুরা কি ভাবে মেনে নিত তোমার এই আলাদা স্বত্বা যে খেলতে যাওয়া, পড়াশোনা করা ছাড়াও আরও অন্য রকম অনেক কিছু করত?

অর্পিতা ঃ আমি দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাগবাজার ভগিনী নিবেদিতায় পড়েছি, আর তারপর দ্বাদশ শ্রেণী পড়েছি লবনহ্রদ বিদ্যাপীঠে। স্কুল ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি, আর বান্ধুরা আমার আবৃত্তি ও অভিনয়ের খুব প্রশংসা করত, উৎসাহ দিত। আর আজ অব্দি যে বন্ধুরা থেকে গেছে, তারা পুরো সময়টাই আমার পাশে থেকেছে, থাকছে এবং তারা সাহায্যও করে নানান ভাবে। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ না করে পারছিনা, স্বাধীন চিত্র পরিচালক ও অভিনেতাদের টাকা- পয়সা সংক্রান্ত সমস্যা লেগেই থাকে। খুব সম্প্রতি, আমি ‘অন্য শহর’ বলে একটি শর্ট ফিল্ম পরিচালনা করলাম, যাতে আমি অভিনয়ও করেছি। শৌমিক বলে আমার এক বন্ধু গোটা স্টুডিও রেকর্ডিং ও ডাবিংএর খরচ দিয়েছে।  তাই, বন্ধুরা আছে মানে যাদের থাকার, তারা পাশে আছে, সাথে আছে।

 

weRbangali: নান্দিকারের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

অর্পিতা ঃ নান্দিকারের সাথে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখেছি। স্টেজে দাঁড়িয়ে কথা বলা, দর্শকের সাথে সংযোগ স্থাপন করা, স্টেজে দাঁড়ানো থেকে হাঁটা- চলা সবটাই বলতে গেলে দেবুদার (শ্রী দেবশঙ্কর হালদার) হাত ধরে শেখা আমার। রুদ্র প্রসাদ স্যারও শিখিয়েছেন অনেক কিছু, তবে বেশি শিখেছি দেবশঙ্কর হালদারের কাছে।

 

weRbangali: আর দেবশঙ্কর হালদারের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা, সেটা কেমন?

অর্পিতা ঃ দেবুদা খুব ভালো মানুষ। তাঁর কাছে যে শুধু অভিনয় শেখা যায় তা নয়, জীবনে চলার ক্ষেত্রেও অনেক কিছু শেখা যায় ওনার থেকে। একটা ঘটনা বলি। দিল্লি NSDতে দেবুদার নির্দেশনায় একটি নাটকে অভিনয় করেছিলাম। সেখানে একটি ছেলের ক্যামেরা হারিয়ে যায় এবং সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, কিন্তু দেবুদা এত সুন্দর করে তাকে বোঝায় যে সে নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নেয়। এই সব কিছুই, যে কিভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়, তা দেবুদার কাছ থেকে শেখা।

 

weRbangali: এবার আসি তোমার কাজের প্রসঙ্গে। ‘অপেক্ষা, The Wait is Life,’ খুব স্পর্শকাতর একটি গল্প। এই গল্পের নেপথ্যে থাকা গল্পটা কি?

অর্পিতা ঃ আমাদের তখন একটা নাটকের দল ছিল, চিত্র পরিচালনায় আসব ভাবিনি। তখনি সন্দিপনের (সন্দিপন দাস, স্বাধীন চিত্র পরিচালক) সাথে আলাপ। ও তাঁর আগে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ বলে একটি শর্ট ফিল্ম করেছে। ওই বলল যে চল নতুন কাজ করি আর তারপর ‘অপেক্ষা...’ হয়। গল্পটা সায়ক বলে একটি ছেলের মাথায় এল আর তারপর কাজ শুরু হয়ে গেল। তবে ‘অপেক্ষা...’ আমাদের প্রথম কাজ তাই অনেক ভুল আছে। সেদিক থেকে বলতে গেলে ‘চিত্রা’ যখন করলাম, সেখানে অনেকটাই পরিণত আমরা আগের থেকে।

 

weRbangali: আর ‘প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ’?

অর্পিতা ঃ ‘প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ’ তারপর করলাম। ওটা আমার আর সন্দিপনের খুব প্রিয় গল্প। কিন্তু তখন আমাদের dslr ছিল না, তাই যতটা ভালো হতে পারত ততটা করা সম্ভব হয়নি।

 

 

weRbangali: ‘অন্য শহর’ স্বাধীন চিত্র পরিচালক হিসেবে তোমার প্রথম পদক্ষেপ। কিভাবে নির্দেশনায় এলে, আর গল্পটার পেছনের গল্পটাই বা কি?

অর্পিতা ঃ তখন সবে ‘Evil Love’ বলে একটি কাজ শেষ হয়েছে আর নতুন গল্পের কথা ভাবা হচ্ছে। তখনি আমি স্ক্রিপ্টটা লিখি। সন্দিপন খুব উৎসাহ দিল, বলল শর্ট ফিল্ম genre-এ মেয়েরা খুব একটা নির্দেশনায় আসে না, তুমি করো। তো, করে ফেল্লাম! তবে, direction is not my cup of tea, আমার জন্য অভিনয়ই ঠিক আছে। নির্দেশক কে অনেক চাপের সম্মুখীন হতে হয়, অত চাপ আমি নিতে পারবনা।

 

weRbangali: তোমার একটা নিজস্ব চিন্তাধারা আছে যা তোমার কাজের ভেতর দিয়েও ফুটে ওঠে। একজন মহিলা স্বাধীন চিত্র পরিচালক হিসেবে তোমার পথ চলাটা কেমন?

অর্পিতা ঃ পথ চলাটা খুব কঠিন, অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথম সমস্যা আর্থিক। কোন প্রযোজক থাকে না তাই পুরোটাই নিজেদের করতে হয়। তাই একটা কাজ করা মানে সবটাই নিজেদের জোগাড় করা। তবে এটা ঠিক যে দিনের শেষে যখন নিজের কাজটা দেখি, সব প্রতিকূলতা পেরিয়েও যখন কাজটাকে জন্মাতে দেখি, সেই আনন্দ এই সব প্রতিকুলতাকে ভুলিয়ে দেয়। সম্প্রতি, ‘অন্য শহর’ পর্তুগাল ফিল্ম ফেস্তিভালে গেছে ও প্রাথমিক স্তরে নির্বাচিতও হয়েছে, বাকিটা অগাস্টে জানতে পারব। তাই, এই পথ চলাটা সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে। তবে এই পথ চলা ও সংগ্রামে সন্দিপন, অরিত্র ও সত্যমের নাম আমি অবশ্যই নেব যারা সব সময় আমার পাশে থেকেছে, থাকে।

 

weRbangali: অভিনন্দন!

ফিল্ম ফেস্টিভালের অভিজ্ঞতা জানতেই হবে তোমার কাছে। কল্পনির্ঝর ফিল্ম ফেস্টিভাল, কলকাতা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভাল আর পর্তুগাল ফিল্ম ফেস্তিভাল- এই অভিজ্ঞতা কেমন? ভয়, ভালোলাগা, প্রশংসিত হওয়া, বিভিন্ন মন্তব্যের সম্মুখীন হওয়া, ঠিক কেমন এই অভিজ্ঞতা? একজন চিত্র পরিচালক ও অভিনেতার জীবনে  তো খুব গুরুত্বপূর্ণ এই অভিজ্ঞতা?

অর্পিতা ঃ হ্যাঁ, এই অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্য রকম। প্রথম নিজের করা একটি সিনেমা বড় পরদায় দেখছি এই অভিজ্ঞতা খুব অন্য রকম। কল্পনির্ঝরে যখন ‘চি্ত্রা’ দেখলাম আর KIFF-এ যখন ‘চিত্র বিচিত্র’ দেখলাম, তখন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিল। আর তার সাথে বুঝতে পারছিলাম নিজেদের কোথায় আরো ঠিক করতে হবে।

 

weRbangali: নেতিবাচক সমালোচনা, সেটা কি ভাবে মেনে নাও?

অর্পিতা ঃ এটা হবেই। কোন সৃষ্টিশীল কাজ করতে গেলে কিছু লোক  ভালো বলবে, কিছু লোক  খারাপ বলবে, তাই দুটোই মেনে নিতে হবে। অভিনয় বা পরিচালনায় আটকে যাওয়া মানে তুমি শেষ, তুমি মৃত। তাই সমালোচনা খোলা মনেই মেনেনি, খারাপ একটু লাগে স্বাভাবিকভাবেই, কিন্তু ওখান থেকে শিক্ষণীয় অংশটাও নিয়েনি।

 

weRbangali: এই যে তোমার never say die attitude আর একটা positive vision, এটাও তো সাহায্য করে। ফেসবুক বলছে তোমার একটা fan page আছে, আর তাতে তোমার গুনাগ্রাহীর সংখ্যাও কম নয়। এই অভিজ্ঞতাটা কেমন যে অনুগামীরা page খুলছে, fans and followers stalk করছে?

অর্পিতা ঃএটা খুব embarrassing কিন্তু! আমি এমন কেউ নই যার fan page থাকবে, তাই বেশ কেমন একটা যেন লাগে।

 

weRbangali: কেউ একজন তো বটেই, একজন Young Achiever

একটু off the track প্রশ্ন করছি, কিন্তু খুব জানতে ইচ্ছে করছে যে মেয়েরা খুব vulnerable জায়গায় থাকে যে কোন জীবিকাতেই। তুমি নিজের কর্মক্ষেত্রে কি ভাবে কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করো? আর, নব্য আগতদের জন্য তুমি এই পরিপেক্ষিতে কি বলতে চাও?

অর্পিতা ঃএকটা কথা আমি সব সময়ই অনুভব করি যে নারী – পুরুষের সম্পর্ক কখনই সেই পর্যায় পৌঁছতে পারে না যদি না মেয়েটি সেই জায়গাটা দেয়। কুইঙ্গিত বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি আসতে পারে, কিন্তু সেটাকে নিজের মতো করে সামলে নেওয়া আমার ওপর। এই সব ইঙ্গিত বা পরিস্থিতিকে অন্য দিকে আমাকেই ঘুরিয়ে দিতে হবে। এখানে জোর করে কেউ রেপ করবে না। তাই, এটা সম্পূর্ণ ভাবে আমার ওপর যে আমি নিজেকে কোথায় দেখতে চাই আর তার জন্য কি করতে চাই।

আর, জ্ঞান দিয়ে লাভ নেই, তবে আমরা মেয়েরা জানি কিভাবে নিজেকে protect করতে হয়, কোথায় নিজেকে কতটা ছাড়তে হয় আর কতটা নয়। তাই, সেই বুদ্ধিটুকু কাজে লাগালেই হবে।

 

weRbangali: খুব প্রাসঙ্গিক কথা বলেছ।

এবার, একটু অন্য কথাও জানি এই আলাপচারিতার শেষ পর্যায়ে এসে। তোমার Facebook page বলছে একজন কবি অর্পিতাও আছে, সেই অর্পিতা কেমন? সে কি ভাবে, কি লেখে?

অর্পিতা ঃ ধুর সেরকম ভালো লিখিনা! কাব্য ঠিক আসে না, চেষ্টা করি। আর  যা লিখি, তা কাব্য নয়।

 

weRbangali: এটা বিনয় হয়ে যাচ্ছে কিন্তু!

সব শেষে জানতে চাইব, তোমার এই পথ চলায় কাদের influence এতটাই যে তাদের ছাড়া চলবে না?

অর্পিতা ঃ আরিত্র, সন্দিপন, সত্যম, শর্মিষ্ঠা ও কনিস্কর নাম বার বার বলব।

 

weRbangali:  অনেক ধন্যবাদ এতটা সময় দেওয়ার জন্য, একটা খুব ভালো আড্ডা মারার জন্য। অনেক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন তোমায়।

অর্পিতা ঃ অনেক ধন্যবাদ!

 



আমাদের উপপদ এর সরঞ্জাম গুলি

আপনার মন্তব্য